সুতরাং জঙ্গিবাদ কেবল নিরাপত্তা ব্যর্থতার ফল নয়; এটি ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং কখনো কখনো পরিকল্পিত অস্থিতিশীলতার ফসল।
এই ধারাবাহিকতা বিবেচনায় বর্তমান পরিস্থিতিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। বরং আমি প্রশ্ন তুলতে চাই—এই নতুন করে ‘জঙ্গি সতর্কতা’ কি কোনো বাস্তব হুমকির প্রতিফলন, নাকি এটি একটি নির্মিত বাস্তবতা, যার উদ্দেশ্য ভিন্ন?
বিশেষ করে পতিত ফ্যাসিস্টকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক করার সুদূরপ্রসারী কোনো প্রকল্প?
এখানে একটি ভয়ংকর বাস্তবতা হচ্ছে—রাষ্ট্রের গোপনীয়তা ভাঙনের অস্বাভাবিক প্রবণতা। পুলিশ সদর দপ্তর কিংবা সেনাসদর দপ্তরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দাপ্তরিক চিঠি, যা সীমিত পরিসরে থাকার কথা, তা কীভাবে দেশের গণমাধ্যমের আগেই বিদেশে অবস্থানরত কিছু কথিত সাংবাদিক বা ইউটিউবারদের হাতে পৌঁছে যায়?
এটি নিছক তথ্য ফাঁস নয়—এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কাঠামোর ভেতরে ফাটলের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারের ভেতরেই কি এমন একটি গোষ্ঠী সক্রিয়, যারা প্রকাশ্যে আনুগত্য দেখালেও আড়ালে ভিন্ন কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছে?
এই সন্দেহ আরো জোরালো হয় সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলোতে। কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনা, বিশেষ করে পেশাদার ও সৎ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও যদি এমন সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য হয়, তাহলে তা কেবল ব্যক্তি নয়—প্রতিষ্ঠানের মনোবলকেও আঘাত করে।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কেবল অস্ত্র বা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে সেই রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সততা, পেশাদারিত্ব ও নৈতিক শক্তির ওপর। কিন্তু যখন তোষামোদ ও অনুগত রাজনীতি দক্ষতা ও সততার ওপর প্রাধান্য পায়, তখন নিরাপত্তা কাঠামো ভেতর থেকেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলের নীতিগুলো নতুন করে আলোচনায় আসে। তার আমলে কথিত জঙ্গিবিরোধী অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রশংসিত হলেও সমালোচকদের অভিযোগ ছিল—একই সঙ্গে ‘জঙ্গিবাদ’ শব্দটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। এই দ্বৈত ব্যবহার একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে—যেখানে প্রকৃত হুমকি ও রাজনৈতিক বয়ানের মধ্যে সীমারেখা ঝাপসা হয়ে গেছে। বর্তমান সরকারের বক্তব্য—জঙ্গিবাদকে অতীতে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ—এই বিতর্ককেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
অন্যদিকে প্রতিবেশী ভারতের ভূমিকাও আলোচনার বাইরে রাখা যায় না। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সহযোগিতা ও নির্ভরতার এক জটিল মিশ্রণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সম্পর্ক কতটা সমতার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে ছিল?






