সারা দেশে হামের সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ ও শিশু মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) । সংস্থাটি বাংলাদেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মূল্যায়ন করেছে। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ইতিমধ্যে ৫৮টি জেলাতেই এই অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে বলে গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এই পরিস্থিতির জন্য মূলত টিকাদানের ঘাটতি এবং রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতায় বড় ধরনের ফাটলকে দায়ী করছে সংস্থাটি।
২০২৬ সালের শুরু থেকেই বাংলাদেশে হাম রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত ৪ এপ্রিল বাংলাদেশের জাতীয় আইএইচআর ফোকাল পয়েন্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে এই অস্বাভাবিক সংক্রমণ বৃদ্ধির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রদান করে। অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে চলমান সংক্রমণের কারণেই মূলত সারা দেশে এই প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশজুড়ে প্রায় ১৯ হাজার ১৬১ জন সন্দেহভাজন হাম রোগীর তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে।
হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ হওয়ার কারণে এটি বাতাসের মাধ্যমে বা আক্রান্ত ব্যক্তির ড্রপলেটের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সংক্রমণের সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিন পর উচ্চ জ্বর, সর্দি, কাশি এবং সারা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। যদিও অনেক ক্ষেত্রে এটি সাধারণ রোগ মনে করা হয়, তবে চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন যে এর ফলে নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস বা মস্তিষ্কে প্রদাহ, অন্ধত্ব এবং এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য হাম একটি প্রাণঘাতী ঝুঁকি বহন করছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে টিকাদান অভিযান শুরু হয়েছে। গত ৩০ মার্চ জাতীয় টিকাদান কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির অনুমোদন দেয়। এর ধারাবাহিকতায় ৫ এপ্রিল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কিছু এলাকায় এবং ২০ এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল প্রদান এবং নিয়মিত তদারকির জন্য জেলা পর্যায়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল বা আরআরটি সক্রিয় করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সব পৌর এলাকায় হামপ্রতিরোধী টিকার অন্তত ৯৫ শতাংশ কভারেজ বজায় রাখা ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। উচ্চ যাতায়াতপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় নজরদারি আরও জোরালো করতে হবে এবং সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হওয়ার সাথে সাথে তাদের আইসোলেশনে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া স্বাস্থ্যকর্মী ও পর্যটন খাতের মতো ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীকেও টিকার আওতায় আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যাতে স্থানীয় সংক্রমণ চিরস্থায়ী রূপ নিতে না পারে।