দেশের ৪১টি জেলায় এখনো এইচআইভি/এইডস পরীক্ষার সুযোগ নেই। ফলে বহু মানুষ রোগ শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। সরকারি ও বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট সংক্রমিতদের প্রায় ১৮ শতাংশ এখনো শনাক্ত হয়নি। আর শনাক্তদের মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ চিকিৎসার আওতার বাইরে রয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে দেশে, বিশেষ করে পুরুষ সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এটি এখন রোগ নিয়ন্ত্রণের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বুধবার রাজধানীর বিএমএ ভবনে আয়োজিত এক কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এইডস হেলথকেয়ার ফাউন্ডেশনের (এএইচএফ) সহযোগিতায় কর্মশালার আয়োজন করে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টাস ফোরাম (বিএইচআরএফ)।
এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়ে প্রথম এক রোগী মারা যায় ২০০০ সালে। ২০২৫ সালে একই রোগে মৃতের সংখ্যা ২৫৪, যা আগের বছরে থেকে কিছু কম।
এইডস/এসটিডি কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, দেশে পুরুষ সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার ২০১৭ সালে ছিল ০.৭ শতাংশ। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩.১ শতাংশে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এই হার আরো বেড়ে প্রায় ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
কর্মশালায় এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে পরীক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, চিকিৎসা সহজলভ্য করা এবং সামাজিক কুসংস্কার দূর করা জরুরি বলে জোর দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিদেশফেরত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।
কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য দেন বিএইচআরএফ-এর সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ। বিশেষ অতিথি ও মূল আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক সাইফ উল্লাহ মুন্সী। এছাড়া কর্মশালার সভাপতিত্ব করেন বিএইচআরএফ-এর সভাপতি প্রতীক ইজাজ।
বাংলাদেশের এইডস পরিস্থিতি, সংকট ও উত্তরণ নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এএইচএফ’র কান্ট্রি ডিরেক্টর আকতার জাহান শিল্পী। এ ছাড়া এইডস রিপোর্টিং, চ্যালেজ্ঞ ও সমাধান নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কালবেলার স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক রাশেদ রাব্বি।
কর্মশালায় আকতার জাহান শিল্পী জানান, দেশে অনুমিত এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তি ১৭ হাজার ৪৮০। এর মধ্যে শনাক্ত হয়েছে ১৪ হাজার ৩১৩ জন। সংক্রমণের হার .০১ শতাংশ। শনাক্ত রোগীদের মধ্যে ৮ হাজার ৫৭৫ চিকিৎসার আওতায় এসেছেন, যা মোট শনাক্তের ৭৪ শতাংশ।
তিনি জানান, আক্রান্তদের ৩৪ শতাংশ পুরুষ সমকামী ও ১৪ শতাংশ পুরুষ যৌনকর্মী। এছাড়া প্রবাসী ১২ শতাংশ, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি ১১ শতাংশ, শিরায় মাদক গ্রহণকারী ৬ শতাংশ, নারী যৌনকর্মী ও হিজড়া ১ শতাংশ করে। এছাড়া ২২ শতাংশ অন্যান্য মানুষ।
আকতার জাহান শিল্পী বলেন, আক্রান্তদের বয়স ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে ৬২.৬১ শতাংশ ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ২১.০৫ শতাংশ। ১০-১৪ বছর বয়সী ০.৬৯ শতাংশ। ৫ বছরের কম বয়সে আক্রান্ত ১. ৯৬ শতাংশ।
কালবেলার স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক রাশেদ রাব্বি বলেন, দেশে এইডসের ক্ষেত্রে এক সময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছিল শিরায় মাদক গ্রহণকারী, প্রবাসী শ্রমিক, নারী যৌনকর্মী, পুরুষ যৌনকর্মী ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষ। ২০২০ সালের পর থেকে দেখা গেছে, সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আক্রান্তের হার বাড়তে শুরু করে এরা এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এসেছে। দ্বিতীয় সবোর্চ্চ হলো প্রবাসী শ্রমিক। এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে আমাদের বিদেশ থেকে ফেরার সময় শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা জরুরি।
অধ্যাপক সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সামাজিকভাবে আক্রমণ বা স্টিগমা করা হলে তারা চিকিৎসা থেকে দূরে সরে যায়। এতে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি আরো বাড়ে। স্টিগমা ও বৈষম্য মানুষকে ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ ঠেলে দেয়, ফলে তারা চিকিৎসা নিতে ভয় পায়।