শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৪ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ

কদমতলীতে প্রেসক্লাবের ছড়াছড়ি, প্রকৃত নির্বাচন হয়েছে কয়বার?

Special correspondent
  • Update Time : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২৪ Time View

১৭ বছরে প্রেসক্লাবের পর প্রেসক্লাব—নির্বাচন কয়বার, কমিটি কতবার?

২০০৯ থেকে ২০২৬—একাধিক সংগঠন, একাধিক কমিটি; কোথাও ব্যালট, কোথাও কণ্ঠভোট, কোথাও সর্বসম্মতি।

২০২৩ সালের নির্বাচন নিয়েও পরস্পরবিরোধী তথ্য। ২০২৬ সালে নির্ধারিত ভোটের আগেই ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত’ কমিটি ঘোষণার অভিযোগ। প্রকৃত ইতিহাস জানতে চাওয়া হচ্ছে মূল নথি।

কদমতলীর সাংবাদিক সংগঠন: ইলেকশন, নাকি সিলেকশনের ইতিহাস?

ইবনে ফরহাদ তুরাগ: কদমতলী একটি থানা এলাকা। অথচ সাংবাদিকদের সংগঠন একাধিক। কখনো প্রেসক্লাব, কখনো রিপোর্টার্স ক্লাব, কখনো প্রেস ইউনিটি, কখনো সাংবাদিক ক্লাব, আবার কখনো মডেল প্রেসক্লাব। ২০০৯ থেকে ২০২৬—গত ১৭ বছরে এভাবেই এই এলাকায় সাংবাদিকদের সংগঠনের নাম বদলেছে, নতুন সংগঠন আত্মপ্রকাশ করেছে, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বদলেছেন একাধিকবার। কিন্তু নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্নের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

কোথাও বলা হয়েছে নির্বাচন, কোথাও কণ্ঠভোট, কোথাও বলা হয়েছে সদস্যদের সম্মতি বা সমঝোতার ভিত্তিতে কমিটি গঠনের কথা। আবার ২০২৬ সালে নির্ধারিত ভোটের আগেই একটি কমিটিকে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত’ ঘোষণা করা হয়েছে—এমন অভিযোগও উঠেছে।

অন্যদিকে ২০০৯ থেকে ২০২৬—এই ১৭ বছরে কদমতলীর সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব আসলে কতবার সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে রয়েছে পরস্পরবিরোধী তথ্য। ফলে সামনে আসছে আরও একটি প্রশ্ন—কদমতলীর সাংবাদিক সংগঠনগুলোর এটি কি নির্বাচনের ইতিহাস, নাকি বিনা ভোটে একের পর এক কমিটি গঠনের ইতিহাস? যা নিয়ে থাকছে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।

নির্বাচনের গল্প অনেক, ব্যালটের প্রমাণ কোথায়?

২০০৯: শুরু ‘রেজিস্টার কদমতলী থানা প্রেসক্লাব’

স্থানীয় সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে ‘কদমতলী থানা প্রেসক্লাব’ নামে একটি সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে আব্দুল আজিজ মাহফুজের নাম উল্লেখ করা হয়। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, ওই সময় ‘কদমতলী থানা প্রেসক্লাব’ নিবন্ধিতও হয়েছিল, যার নিবন্ধন নং: এস-৯৬৬০। তবে সংগঠনটির নিবন্ধন নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ‘শ্যামপুর-কদমতলী-যাত্রাবাড়ী থানা প্রেসক্লাব’ নামে একটি সংগঠন ২০০৯ সালে সরকারি অনুমোদন বা নিবন্ধন লাভ করে, যার নিবন্ধন নম্বর এস-৯৮৫০।

ফলে প্রশ্ন দেখা দেয়—২০০৯ সালে আসলে কোন সংগঠন নিবন্ধিত হয়েছিল, বর্তমান ‘কদমতলী থানা প্রেসক্লাব’-এর সঙ্গে সেই নিবন্ধনের আইনগত ও সাংগঠনিক সম্পর্ক কী এবং পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা সংগঠনগুলো একই ধারাবাহিকতার অংশ কি না। এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর পেতে প্রয়োজন মূল নিবন্ধন সনদ ও নথি, দাবি সংশ্লিষ্টদের।

২০১৫: ‘কদমতলী রিপোর্টার্স ক্লাব’

এরপর ২০১৫ সালে সামনে আসে ‘কদমতলী রিপোর্টার্স ক্লাব’। স্থানীয় সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই সংগঠনের সভাপতি ছিলেন জাকির মাঝি।

সাংবাদিকদের একটি অংশের দাবি, এ সময় নেতৃত্ব সরাসরি সদস্যদের ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচিত না হয়ে সম্মতি বা সমঝোতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছিল। অর্থাৎ সংগঠন গঠিত হলেও প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়টি তখনও স্পষ্ট ছিল না।

২০১৮: ‘কদমতলী প্রেস ক্লাব’

২০১৮ সালে আবির্ভাব ঘটে ‘কদমতলী প্রেস ক্লাব’-এর। স্থানীয় সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই সংগঠনের সভাপতি ছিলেন শিবলী, সেক্রেটারি ছিলেন মাহমুদুল হাসান এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন এস কে সবুজ আহমেদ।

স্থানীয় সাংবাদিকদের দাবি, এ সময় নেতৃত্ব সরাসরি সদস্যদের ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচিত না হয়ে সিলেকশনের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছিল।

২০২০: ‘কদমতলী থানা প্রেস ইউনিটি’

২০২০ সালে আত্মপ্রকাশ করে ‘কদমতলী থানা প্রেস ইউনিটি’। সংগঠনটির সভাপতি হিসেবে শিবলীর নাম পাওয়া যায়।

স্থানীয় সাংবাদিকদের একাংশের বক্তব্য, এ ক্ষেত্রেও প্রত্যক্ষ ভোটের পরিবর্তে সম্মতি বা বাছাইয়ের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফলে সংগঠনের নাম ও নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

২০২২: আবার ‘কদমতলী থানা প্রেসক্লাব, ঢাকা’

২০২২ সালে আবার ‘কদমতলী থানা প্রেসক্লাব, ঢাকা’ নামে সংগঠনের সভাপতি হিসেবে সুমন চৌধুরীর নাম সামনে আসে।

অর্থাৎ একদিকে সংগঠনের নাম পরিবর্তন, অন্যদিকে নতুন সংগঠনের আত্মপ্রকাশ এবং নেতৃত্ব পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা চলতে থাকে। তবে ২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এসব নেতৃত্বের কতগুলো সরাসরি সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল—তার সুস্পষ্ট নথিভিত্তিক তথ্য নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যেই রয়েছে ভিন্নমত।

২০২৩: ইতিহাসের প্রথম নির্বাচন, নাকি সম্মতিতে কমিটি?

কদমতলীর সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় ২০২৩ সালকে ঘিরে।

স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি পক্ষের দাবি, ওই বছর সরাসরি ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং অ্যাডভোকেট মহিউদ্দিন আহমেদ শাহীন সভাপতি ও মাহমুদুল হাসান সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। তাদের দাবি, ২০০৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কদমতলীর সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচনের মধ্যে এটিই ছিল একমাত্র সরাসরি ব্যালটভিত্তিক নির্বাচন।

তবে ২০২৩ সালের নির্বাচন নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে একাধিক কমিটির তথ্য পাওয়া যায়।

২৩ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে প্রকাশিত একটি অনলাইন প্রতিবেদনে কমিটিকে ‘চতুর্থ নির্বাচন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একইসঙ্গে সদস্যদের সম্মতিতে কমিটি ঘোষণার কথাও বলা হয়। সেখানে এসএইচ শিবলীকে সভাপতি, সুমন চৌধুরীকে নির্বাহী সভাপতি এবং জাকির এইচ তালুকদারকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে, ৪ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ব্যাপক সংখ্যক প্রতিবেদনে কদমতলী থানা প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা বলা হয় এবং অ্যাডভোকেট মহিউদ্দিন আহমেদকে সভাপতি ও মাহমুদুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ফলে একই বছর, একই সংগঠনকে ঘিরে নেতৃত্ব ও নির্বাচন সম্পর্কে ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ২০২৩ সালের একটি প্রকাশিত প্রতিবেদনে ‘চতুর্থ নির্বাচন’ বলা হলেও সদস্যদের সম্মতি, স্বাক্ষর এবং হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের জুম মিটিংয়ের মাধ্যমে কমিটি ঘোষণার তথ্যও উল্লেখ করা হয়।

যার ফলে স্থানীয় সাংবাদিকদের দাবি থাকলেও ২০২৩ সালে প্রকৃতপক্ষে ব্যালট নির্বাচন হয়েছিল, নাকি সদস্যদের সম্মতিতে কমিটি গঠিত হয়েছিল—এ প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর পেতেও প্রয়োজন নির্বাচন সংক্রান্ত মূল নথি।

২০২৪: ‘কদমতলী থানা সাংবাদিক ক্লাব’—কণ্ঠভোটে নতুন নেতৃত্ব

এরপর ২০২৪ সালে সামনে আসে ‘কদমতলী থানা সাংবাদিক ক্লাব’ নামে আরেকটি সংগঠন। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কদমতলী থানাধীন বসবাসরত প্রবীণ ও নবীন সাংবাদিকদের একত্রিত করার উদ্যোগে সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। রায়েরবাগে অ্যাডভোকেট মহিউদ্দিন আহমেদের নিজস্ব অফিসে সাংবাদিকরা একত্রিত হয়ে সংগঠন গঠনের বিষয়ে সম্মতি দেন। পরে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হয়।

ওই কমিটিতে সুমন চৌধুরী সভাপতি এবং মাহমুদুল হাসান সাধারণ সম্পাদক হন। অ্যাডভোকেট মহিউদ্দিন আহমেদকে সিনিয়র সহসভাপতি করা হয় বলেও প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কণ্ঠভোট এবং গোপন ব্যালটভিত্তিক নির্বাচন একই প্রক্রিয়া নয়। কণ্ঠভোটে উপস্থিত সদস্যদের প্রকাশ্য মতামতের ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হতে পারে। কিন্তু ব্যালট নির্বাচনে ভোটার তালিকা, প্রার্থী, ভোটগ্রহণ, ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া থাকে।

২০২৫: সাংবাদিক ক্লাবের সর্বসম্মতিতে ২৩ সদস্যের কমিটি

২০২৫ সালে আবার ‘কদমতলী থানা সাংবাদিক ক্লাব’-এর নতুন কমিটি গঠনের তথ্য সামনে আসে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এক বছরের জন্য ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওই কমিটিতে সুমন চৌধুরী সভাপতি, মো. সোলাইমান সাধারণ সম্পাদক এবং রনি মজুমদার সাংগঠনিক সম্পাদক হন।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এর আগে ২৭ জুন অনুষ্ঠিত বার্ষিক ফল উৎসবে উপস্থিত সাংবাদিকদের সম্মতিক্রমে সুমন চৌধুরী ও মো. সোলাইমানকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ এখানেও নেতৃত্ব গঠনের ভিত্তি ছিল সর্বসম্মতি বা সম্মতি, প্রত্যক্ষ ব্যালট নির্বাচন নয়।

২০২৬: চার সংগঠন এক ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ

২০২৬ সালের জুনে কদমতলীর সাংবাদিক সংগঠনগুলোর বিভক্তি কমিয়ে কয়েকটি সংগঠনকে একটি ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় কদমতলী থানা প্রেসক্লাব, কদমতলী রিপোর্টার্স ক্লাব, কদমতলী প্রেসক্লাব এবং কদমতলী থানা সাংবাদিক ক্লাবকে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সিদ্ধান্ত হয়, পুরোনো বিভাজন দূর করে ‘কদমতলী থানা প্রেসক্লাব, ঢাকা’ নামে একটি সংগঠন গঠন করা হবে এবং এর নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য নির্বাচন আয়োজন করা হবে। এ লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয় এবং নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয় ১৪ আগস্ট ২০২৬। এরপর তৈরি হয় ব্যতিক্রম ইতিহাস।

১৩ আগস্ট: উত্তপ্ত সভা, পদত্যাগ নির্বাচন কমিশনের

কিন্তু নির্বাচনের ঠিক আগের দিন ১৩ আগস্ট সদস্য ও প্রার্থীদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সভায় ‘সংস্কারের পর নির্বাচন’ ও ‘ভোটের তারিখ’ পরিবর্তনের আলোচনাকে কেন্দ্র করে এক পক্ষের অসৌজন্যমূলক আচরণে সেখানে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে নির্বাচন কমিশন পদত্যাগ করে। সভাটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে একজন প্রার্থীর বক্তব্য নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, সভার ওই পরিস্থিতির কারণে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে কি না—এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয় এবং পরে কমিশন পদত্যাগ করে।

২২ আগস্ট: ভোটের বদলে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত’?

নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগের পরই তৈরি হয় নতুন বিতর্ক।

অভিযোগ ওঠে, নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন না করেই একটি পক্ষ নিজেদের উদ্যোগে একটি কমিটিকে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত’ ঘোষণা করে। অন্য প্রার্থী ও সদস্যদের অংশগ্রহণ ছিল না বলেও অভিযোগ করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই কমিটিকে বিজয়ী দেখিয়ে একটি ব্যানার ছড়িয়ে পড়ে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানান।

এ ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি পক্ষ আপত্তি জানায়, গণস্বাক্ষর সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় এবং প্রয়োজনে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানায়।

তাদের প্রশ্ন ছিল—নির্বাচন কমিশন পদত্যাগ করার পর নতুন কমিশন গঠন না করে কীভাবে কোনো কমিটি নির্বাচিত হতে পারে? যেখানে একাধিক প্রার্থী ছিলেন, সেখানে অন্য প্রার্থী ও সদস্যদের অংশগ্রহণ ছাড়া কীভাবে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নির্বাচিত ঘোষণা করা হলো?

২৬ আগস্ট: পরে আবার ‘নির্বাচন প্রস্তুতি কমিটি’

পরবর্তীতে ওই ‘নির্বাচিত কমিটি’র পরিবর্তে ‘নির্বাচন প্রস্তুতি কমিটি’ গঠনের তথ্য সামনে আসে। সেখানে সুমন চৌধুরীকে উপদেষ্টা করা হয়। আগস্টে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের জন্য আগামী তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

প্রস্তুতি কমিটিতে দায়িত্বপ্রাপ্তরা হলেন—সভাপতি: সরকার জামাল, সাধারণ সম্পাদক: মো. জাহিদ হাসান পিন্টু, সাংগঠনিক সম্পাদক: আশিকুর রহমান।

অর্থাৎ ১৪ আগস্টের নির্ধারিত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একের পর এক তারিখ পেছানো, সংস্কারের প্রয়োজন, প্রার্থীদের অসৌজন্যমূলক আচরণ, নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ, এরপর নতুন কমিশন গঠন না করে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত’ কমিটি ঘোষণার অভিযোগ এবং পরে আবার নির্বাচন প্রস্তুতি কমিটি গঠন—পুরো ঘটনাপ্রবাহই নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করে।

২৬ আগস্ট: একই সময়ে ‘কদমতলী থানা রিপোর্টার্স ক্লাব’এর আত্মপ্রকাশ

যখন সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজনের আশঙ্কা করে কয়েকটি সাংবাদিক সংগঠনকে একীভূত করে একটি সংগঠন গঠনের উদ্যোগ চলছিল, তখন কদমতলী থানা প্রেসক্লাব, ঢাকার আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মনোনয়ন নেওয়া প্রার্থী ও সদস্যদের একাংশ মিলে প্রস্তাবিত ‘কদমতলী থানা রিপোর্টার্স ক্লাব’ নামে একটি আহ্বায়ক কমিটির আত্মপ্রকাশ করে। যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলোচনার সঙ্গে প্রকাশ পায়।

এ সময় আহ্বায়ক হিসেবে খোরশেদ আলম শিকদার, সদস্য সচিব কে এম সোলায়মান এবং যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসানকে রেখে কমিটি ঘোষণা করা হয়।

১ সেপ্টেম্বর: বিতর্কের আশঙ্কা দেখিয়ে নাম পরিবর্তন

এরই মধ্যে রাতারাতি নির্বাচন কমিশনের একটি সিদ্ধান্তে উল্লেখিত ‘কদমতলী থানা রিপোর্টার্স ক্লাব’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘কদমতলী থানা মডেল প্রেসক্লাব’ করা এবং নতুন সাংবাদিক সংগঠন ও আহ্বায়ক কমিটি গঠনের তথ্যও গণমাধ্যমের সামনে আসে।

এতে স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দেয়।

একদিকে যখন চারটি সংগঠনকে এক ছাতার নিচে এনে একটি শক্তিশালী সংগঠন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে একই সময়ে নতুন নামে আরেকটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটলে বিভাজন কমছে, নাকি সংগঠনের সংখ্যা আরও বাড়ছে—সে প্রশ্নও সামনে আসে।

১৭ বছরের টাইমলাইনে কী দেখা যায়?

কদমতলীর ১৭ বছরের এই ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায়, ২০০৯ সালে একটি সংগঠনের যাত্রা, ২০১৫ সালে ‘কদমতলী রিপোর্টার্স ক্লাব’, ২০১৮ সালে ‘কদমতলী প্রেস ক্লাব’, ২০২০ সালে ‘কদমতলী থানা প্রেস ইউনিটি’, ২০২২ সালে ‘কদমতলী থানা প্রেসক্লাব, ঢাকা’, ২০২৩ সালে ব্যালট ভোটে প্রথম নির্বাচন এবং অনুমোদিত কমিটি নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য, ২০২৪ সালে ‘কদমতলী থানা সাংবাদিক ক্লাব’ ও কণ্ঠভোটে নেতৃত্ব, ২০২৫ সালে সর্বসম্মতিক্রমে নতুন কমিটি এবং ২০২৬ সালে চার সংগঠনকে একত্রিত করে নতুন নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এরপর ১৩ আগস্ট নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ, ১৪ আগস্টের নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা, পরে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত’ কমিটি ঘোষণার অভিযোগ এবং শেষ পর্যন্ত আবার ‘নির্বাচন প্রস্তুতি কমিটি’ গঠন করা হয়। একই সময়ে ‘কদমতলী থানা মডেল প্রেসক্লাব’-এর আত্মপ্রকাশও নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।

নির্বাচন, কণ্ঠভোট ও সম্মতি—গণতান্ত্রিক বৈধতা এক?

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—নির্বাচন, কণ্ঠভোট, সম্মতি ও কমিটি গঠন কি একই বিষয়?

সদস্যদের সরাসরি ভোটে ব্যালটের মাধ্যমে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ নেতৃত্ব নির্বাচন একটি প্রক্রিয়া। অন্যদিকে সদস্যদের সম্মতি, সমঝোতা বা কণ্ঠভোটে নেতৃত্ব নির্ধারণ আরেকটি প্রক্রিয়া। আবার কোনো নির্বাচন কমিশন ছাড়া একটি পক্ষের উদ্যোগে কমিটি ঘোষণা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। তাই এসব পদ্ধতিকে একই অর্থে ‘নির্বাচন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলে সংগঠনের গণতান্ত্রিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

ইলেকশন নাকি সিলেকশন—উত্তর মিলবে নথিতে

কদমতলীর সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচনের ইতিহাস নিয়ে চলমান বিতর্কের নিরপেক্ষ সমাধান হতে পারে একমাত্র নথি প্রকাশের মাধ্যমে। সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মূল নিবন্ধন সনদ, অনুমোদিত গঠনতন্ত্র, সদস্য ও ভোটার তালিকা, নির্বাচন কমিশন গঠনের নথি, মনোনয়নপত্র, ব্যালট পেপার, ভোট গণনার ফলাফল, নির্বাচন কমিশনের কার্যবিবরণী এবং ফলাফল ঘোষণার লিখিত নথি প্রকাশ করা হলে কোন কমিটি কীভাবে গঠিত হয়েছিল—তা স্পষ্ট করা সম্ভব।

বিশেষ করে ২০২৩ সালের কথিত ব্যালট নির্বাচন, ২০২৪ সালের কণ্ঠভোট, ২০২৫ সালের সর্বসম্মতিক্রমে কমিটি গঠন এবং ২০২৬ সালের নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের মূল নথি প্রকাশের দাবি উঠছে। কারণ এসব নথিই নির্ধারণ করতে পারে—কোনটি প্রকৃত নির্বাচন, কোনটি সম্মতিভিত্তিক কমিটি এবং কোনটি কেবল ঘোষণা।

সাংবাদিক সমাজের কাছে মূল প্রশ্ন: ১৭ বছরে নির্বাচন কয়বার?

কদমতলীর সাংবাদিক সংগঠনের ইতিহাসে ‘নির্বাচন’ শব্দটি বহুবার এসেছে। কিন্তু নির্বাচন মানেই কি ব্যালট—সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।

২০২৩ সালের ঘটনাকে স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি পক্ষ সরাসরি ব্যালট নির্বাচন হিসেবে দাবি করছে। আবার ওই সময়ের প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে সদস্যদের সম্মতি ও অনলাইন সভার মাধ্যমে আরেকটি কমিটি ঘোষণার কথাও রয়েছে।

২০২৪ সালে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্ধারণের তথ্য রয়েছে। ২০২৫ সালে সর্বসম্মতিক্রমে কমিটি ঘোষণার তথ্য রয়েছে। আর ২০২৬ সালে নির্বাচন আয়োজনের আগেই নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ এবং নির্বাচন ব্যতীত কথিত ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত’ কমিটি ঘোষণার অভিযোগ এবং পরে নির্বাচন প্রস্তুতি কমিটি গঠনের বৈধতা নিয়েও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ফলে ২০০৯ থেকে ২০২৬—এই ১৭ বছরে কদমতলীর সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে আসলে কয়বার নির্বাচিত হয়েছে—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে এর উত্তর কোনো পক্ষের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট কিংবা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নয়—নির্বাচনের মূল নথি দিয়েই প্রমাণ হওয়া উচিত।

পরিশেষে

প্রেসক্লাবের নাম অনেক হতে পারে, সংগঠন একাধিক হতে পারে, কমিটিও হতে পারে একের পর এক। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকও সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারেন।

তবে একটি সাংবাদিক সংগঠনের গণতান্ত্রিক বৈধতা কতটা শক্তিশালী—তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো সদস্যদের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছ নির্বাচনপ্রক্রিয়া এবং সেই নির্বাচনের সংরক্ষিত নথি। কারন একটি সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্বের প্রকৃত গণতান্ত্রিক বৈধতা আসে একমাত্র সদস্যদের ভোটে—শুধু ঘোষণায় নয়।

ইএসবি/নিউজ

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© 2026 All rights reserved © eisomoyebangladesh
কারিগরি সহযোগিতায়: Bangla Webs
ThemesBazar-Jowfhowo