একই এলাকায় কাছাকাছি নামের একাধিক সংগঠন ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হচ্ছে ব্যাপক বিভ্রান্তি!
সাংবাদিকতার পরিচয় সংকট!
প্রেসক্লাবের নামে বিভাজন
গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ কোন পথে? (পর্ব: ০১)

কদমতলীতে একের পর এক প্রেসক্লাব,
সাংবাদিকতা নাকি সংগঠনের মহড়া?
ইবনে ফরহাদ তুরাগ: কদমতলীতে প্রেসক্লাবের আত্মপ্রকাশ চলছে, নাকি ‘প্রেসক্লাব’ নামের আত্মীয় বাড়ছে? কদমতলী থানা মডেল প্রেসক্লাব, কদমতলী থানা প্রেসক্লাব, কদমতলী থানা প্রেসক্লাব, ঢাকা—নামগুলো শুনলে মনে হয়, একই পরিবারের একের পর এক ‘খালতো ভাই’ সাংবাদিকতার মাঠে হাজির হচ্ছে!
একই থানা, একই এলাকা এবং প্রায় একই ধরনের নাম নিয়ে একের পর এক সাংবাদিক সংগঠনের আত্মপ্রকাশ এখন শুধু হাস্যরসের বিষয় নয়; বরং তা কদমতলীর সাংবাদিক সমাজ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি করছে।
প্রকৃত সাংবাদিক সংগঠন চেনার উপায় কী?
প্রশ্ন উঠছে—একটি এলাকায় একই নামের এতগুলো প্রেসক্লাবের প্রয়োজন কেন? এসব সংগঠনের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? কোন সংগঠনের সাংগঠনিক ইতিহাস কী? সদস্যদের পেশাগত পরিচয় কীভাবে যাচাই করা হয়েছে? আর সাধারণ মানুষই বা কোন সংগঠনকে প্রকৃত সাংবাদিক সংগঠন হিসেবে চিনবে?
কদমতলীতে সময়ের সঙ্গে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন গড়ে উঠেছে। এসব সংগঠনের প্রত্যেকটির নিজস্ব ইতিহাস, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কার্যক্রম থাকার কথা। কিন্তু একই এলাকার নামকে কেন্দ্র করে কাছাকাছি নামের একাধিক সংগঠন তৈরি হলে স্বাভাবিকভাবেই পরিচয় ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি হয়।
বিশেষ করে ‘প্রেসক্লাব’, ‘থানা প্রেসক্লাব’, ‘মডেল প্রেসক্লাব’ কিংবা একই নামের সঙ্গে ‘ঢাকা’ যুক্ত করে নতুন সংগঠনের আত্মপ্রকাশ—এসব ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্ন তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
কারণ একটি সাংবাদিক সংগঠনের পরিচয় কেবল একটি নাম বা সাইনবোর্ডে সীমাবদ্ধ নয়। একটি সংগঠনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে তার ইতিহাস, গঠনতন্ত্র, সদস্যদের পেশাগত পরিচয়, সাংগঠনিক স্বচ্ছতা, নিয়মিত কার্যক্রম এবং জবাবদিহির ওপর।
ইতিহাসই যেখানে আসল পরিচয়!
কদমতলীর সাংবাদিক সংগঠনগুলোরও কিছু বিতর্কিত ইতিহাসও রয়েছে। এখানে কেন গড়ে উঠেছে এতগুলো প্রেসক্লাব? কে আগে, কে পরে—কোন সংগঠন কী প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কোন কমিটি নির্বাচনে জয় হয়েছে, কোন কমিটির সিলেকশনে বিজয়ী হয়েছে—এসব তথ্য ভবিষ্যতে ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।
আর ইতিহাসের সঙ্গে থাকে জবাবদিহিতাও।
কোনো সংগঠন যদি নিজেকে সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন হিসেবে দাবি করে, তাহলে তার কাছে স্বাভাবিকভাবেই জানতে চাওয়া যেতে পারে—তার সদস্য কারা, তাদের পেশাগত পরিচয় কী, সংগঠনের গঠনতন্ত্র কোথায়, নেতৃত্ব কীভাবে নির্বাচিত হয় এবং সংগঠনটি সাংবাদিকদের স্বার্থে কী ভূমিকা পালন করছে?
সাংবাদিকদের মতে, এসব প্রশ্ন কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকে হেয় করার জন্য নয়; বরং একটি পেশাদার সাংবাদিক সমাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
‘রিপোর্টার্স ক্লাব-সাংবাদিক ক্লাব’ কেন ছিল ব্যতিক্রম?
এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি আত্মপ্রকাশ করা ‘কদমতলী থানা রিপোর্টার্স ক্লাব’ ও ২০২৫ সালে ‘কদমতলী থানা সাংবাদিক ক্লাব’ নামটিও আলাদা করে আলোচনায় আসে। কারণ ‘রিপোর্টার্স-সাংবাদিক’ শব্দটি সরাসরি সংবাদ সংগ্রহ ও রিপোর্টিং পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত গণমাধ্যম কর্মীদের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। তাই এরকম নামের মধ্যেই ছিল একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য। একই ধরনের ‘প্রেসক্লাব’ নামের ভিড়ে ‘রিপোর্টার্স-সাংবাদিক ক্লাব’ কে আলাদা করে চেনার সুযোগ তৈরি করেছিল।
তবে নাম আলাদা হলেই কোনো সংগঠন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। শেষ পর্যন্ত সংগঠনের কাজ, সদস্যদের যোগ্যতা, স্বচ্ছতা, নিয়মনীতি ও জবাবদিহিই তার প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করে।
নামের মিল, মানেই বিভ্রান্তির আশঙ্কা! সমাধান কোথায়?
একই এলাকায় কাছাকাছি নামের একাধিক সংগঠন থাকলে সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে পরিচয় নিয়ে। কোনো অনুষ্ঠান, বিবৃতি, সংবাদ সম্মেলন কিংবা সামাজিক কার্যক্রমে কোন সংগঠন কথা বলছে—তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
এমনকি কোনো সংগঠনের কর্মকাণ্ড বা বিতর্কের দায়ও ভুল করে অন্য সংগঠনের ওপর বর্তানোর আশঙ্কা থাকে। তাই সাংবাদিক সংগঠনের নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক বিতর্ক ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে গঠনতন্ত্র, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং কর্মপরিকল্পনা নিশ্চিত করে স্বাতন্ত্র্য, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের সাথে সেই নামে সরকারিভাবে অনুমোদন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রেসক্লাব বেশি, তাহলে সাংবাদিকদের ঐক্য কোথায়?
সাংবাদিকতার মূল শক্তি হচ্ছে তথ্য, সত্য ও পেশাগত ঐক্য। কিন্তু একই এলাকায় একের পর এক সংগঠন তৈরি হতে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—সংগঠন বাড়ছে, নাকি সাংবাদিকদের বিভাজন বাড়ছে?
প্রেসক্লাবের সংখ্যা বৃদ্ধি কোনো অর্জন নয়। বরং একটি এলাকার সাংবাদিকরা কতটা ঐক্যবদ্ধ, কতটা পেশাদার এবং কতটা জবাবদিহিমূলক—সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা। একই এলাকার সাংবাদিকরা যদি একাধিক সংগঠনে বিভক্ত হয়ে পড়েন, তাহলে প্রকৃত সাংবাদিকদের পেশাগত স্বার্থ কতটা শক্তিশালীভাবে উপস্থাপিত হবে—সেটি মূলত ভাবার বিষয়।
ইতিহাস সৃষ্টিতে চাই পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
কদমতলীতে নতুন কোনো সাংবাদিক সংগঠন আত্মপ্রকাশ করতেই পারে, নতুন কিছু নয়। সংগঠন করার অধিকারও সংশ্লিষ্টদের রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রয়োজন সংগঠনগুলোর ব্যতিক্রম পরিচয়, গঠনপ্রক্রিয়া, সদস্যপদ, নেতৃত্ব ও কার্যক্রম নিয়ে স্বচ্ছতা। কারণ সাংবাদিক সংগঠন সাধারণ কোনো ক্লাব নয়। এটি সাংবাদিকদের পেশাগত পরিচয় ও মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাই প্রশ্ন থাকতেই পারে—👇
কদমতলীতে আর কত প্রেসক্লাব হবে?
একই ধরনের নাম নিয়ে আর কত সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটবে?
নতুন সংগঠনগুলো কীভাবে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠা করবে?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— কদমতলীর সাংবাদিকদের জন্য কি প্রয়োজন আরও একটি নতুন প্রেসক্লাব, নাকি প্রয়োজন একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সাংবাদিক প্ল্যাটফর্ম?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো সময়ই দেবে। তবে ইতিহাসের পাতায় একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার—নাম অনেক হতে পারে, সাইনবোর্ড অনেক হতে পারে; কিন্তু সাংবাদিকতার প্রকৃত পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে হয় কাজ দিয়ে।
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রেসক্লাবের সংখ্যা নয়, সাংবাদিকতার মান ও গ্রহণযোগ্যতাই ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।
ইএসবি/নিউজ