বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১০ পূর্বাহ্ন
শিরোনামঃ
এথনিক ক্লিনজিং কি চলতেই থাকবে? সরকারের সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দল বদলের সরকার নয়- দরকার রাষ্ট্রীয় কাঠামো বদলের সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তিনটি ককটেল বিস্ফোরণ আসিফ নজরুলের গ্রেফতার চাইলেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী গণতন্ত্রকে রক্ষা করাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব : রাষ্ট্রপতি হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে কিশোরী ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ২ জনের মৃত্যুদণ্ড ৪ দেশে ১১ হাজার কোটি পাচার ও নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ: আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান কদমতলী থানা প্রেসক্লাব ঘিরে বিরোধ: কমিটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন, বাড়ছে বিভাজনের আশঙ্কা শান্ত হচ্ছে সাগর, চার বন্দরে নামলো বিপদের লাল নিশানা

ভোটের আগেই ‘বিজয়ী ঘোষণা’—কদমতলী থানা প্রেসক্লাব নির্বাচন ঘিরে বিস্ফোরক সব অভিযোগ, নেপথ্যে কারা?

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৪১ Time View

নির্বাচন নাকি সিলেকশন—ভোট ছাড়াই কমিটি ঘোষণার হিরিক কদমতলী থানা প্রেস ক্লাবে..

নির্বাচন ছাড়াই সভাপতি ঘোষণা? সদস্য-প্রার্থীর যোগ্যতা, সাংবাদিক পরিচয়, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও মামলা নিয়ে প্রশ্ন; নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ঘিরে ১৮ অভিযোগ, অপ্রকাশিত ছয় শর্ত, কমিশনের পদত্যাগ ও নির্বাচনী ব্যয়ের জবাবদিহি নিয়েও বিতর্ক, একাধিক প্রেসক্লাব তৈরির পরিস্থিতির দায় কার?

ইবনে ফরহাদ তুরাগ: একটি প্রেসক্লাবের আসন্ন নির্বাচন। অথচ প্রশ্নের তালিকা যেন একের পর এক ফাইল। এবার ভোটের মাঠে লড়াই শুরুর আগেই খুলে গেছে অভিযোগের সব ‘কালো বাক্স’।

কদমতলী থানা প্রেসক্লাবের এবারের নির্বাচন ঘিরে সদস্য ও প্রার্থীদের যোগ্যতা, সাংবাদিক পরিচয়, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, মামলা, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, নতুন শর্ত, নির্বাচনী ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত ভোট ছাড়াই সভাপতি ও অন্যান্য পদে ব্যক্তিদের নির্বাচিত ঘোষণার অভিযোগ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা।

২০৭ সদস্যের মধ্যে কারা প্রকৃত সাংবাদিক, কারা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়, কারা আওয়ামী দোসর, কার বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যা মামলা আছে, কার বিরুদ্ধে মামলার এজাহার চলমান, কার সাংবাদিক পরিচয় ও কর্মরত প্রতিষ্ঠান বৈধ, কার আইডি কার্ডের মেয়াদ আছে, কার সদস্যপদ গঠনতন্ত্র অনুযায়ী হয়েছে—এসব বিষয় যথাযথভাবে যাচাই হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের একটি অংশ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে ১৮টি অভিযোগ ও প্রশ্ন। গঠনতন্ত্র ও লিখিত আচরণবিধি স্পষ্ট না করেই নির্বাচন পরিচালনা শুরু করা, প্রার্থীদের কাছ থেকে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার পর নতুন ছয়টি শর্ত সামনে আনা, গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সময় ক্যামেরা বন্ধ রাখার অভিযোগ এবং মাঝপথে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ—নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই সভাপতি ও অন্যান্য পদে ব্যক্তিদের নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে। অভিযোগটি সত্য হলে প্রশ্ন উঠছে, ভোটগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা কোথায়? আর একটি নির্বাচন আয়োজন করতে গিয়ে যদি শেষ পর্যন্ত একটি সংগঠনের পরিবর্তে একাধিক প্রেসক্লাব তৈরির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, সেই দায়ই বা কার?

সদস্য তালিকা নিয়েই প্রথম প্রশ্ন

একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো বৈধ সদস্য ও ভোটার নিশ্চিত করা। কিন্তু কদমতলী থানা প্রেসক্লাবের নির্বাচন ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে—চূড়ান্ত সদস্য ও প্রার্থী তালিকা তৈরির আগে প্রত্যেকের যোগ্যতা কতটা যাচাই করা হয়েছে?

সংশ্লিষ্টদের দাবি, সদস্য ও প্রার্থীদের সাংবাদিক পরিচয়, গণমাধ্যমে কর্মরত থাকার প্রমাণ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, মিডিয়া আইডির মেয়াদ এবং গঠনতন্ত্রে থাকা অন্যান্য শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন ছিল। যাচাই হয়ে থাকলে তার পদ্ধতি, নথি ও সংস্কার পরবর্তী ফলাফল সদস্যদের সামনে প্রকাশ করার দাবিও উঠেছে।

কে প্রকৃত সাংবাদিক?

প্রেসক্লাবের প্রার্থী ও সদস্যদের মধ্যে কারা নিয়মিত সাংবাদিকতায় যুক্ত, কার নিয়োগ বৈধ এবং সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের অস্তিত্ব ও বৈধতা আছে কি না—এসব বিষয় নিয়েও এখন আলোচনা চলছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু একটি মিডিয়া আইডি কার্ড থাকলেই সাংবাদিকতার পরিচয় নিশ্চিত হয় না। তাদের দাবি, নিয়োগপত্র, প্রত্যয়ন, প্রকাশিত সংবাদ, কর্মরত থাকার প্রমাণ এবং প্রয়োজনীয় পেশাগত নথিও যাচাই করা উচিত। তবে অভিযোগ উঠলেই কাউকে ‘ছদ্মবেশী সাংবাদিক’ বলা যাবে না। এক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রমাণ গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকা জরুরি।

রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন

নির্বাচনে অংশ নেওয়া সদস্য বা প্রার্থীদের কেউ রাজনৈতিক দলের সক্রিয় পদধারী, কর্মী, প্রচারক কিংবা প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত কি না—এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকরা বলেন—কদমতলী থানা প্রেসক্লাবের কেউ যদি নিজেদের আওয়ামী লীগের পদধারী হয়েও ভুয়া কমিটি গঠন করে সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দেয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ, মামলা ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র শ্যামপুর, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী ও ডেমরা থানায় জমা দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করা প্রয়োজন, যাতে তারা মিথ্যা পরিচয় ব্যবহার করতে না পারে।

তবে রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা নিজেই অপরাধ নয়। তাদের দাবি, প্রেসক্লাবের গঠনতন্ত্রে সক্রিয় রাজনৈতিক পদ বা দলীয় সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোনো বিধিনিষেধ থাকলে তা দল-মত নির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

মামলা থাকলেই কি অযোগ্য?

প্রার্থীদের বিরুদ্ধে জুলাই হত্যাকাণ্ড-সংক্রান্ত মামলা, এজাহারভুক্ত মামলা, বিচারাধীন মামলা কিংবা অতীতের মামলা বা দণ্ডের তথ্য যাচাইয়ের দাবিও উঠেছে। তবে মামলায় নাম থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। তাই কারও বিরুদ্ধে মামলা থাকলে এজাহার, মামলার বর্তমান অবস্থা, অভিযোগপত্র, আদালতের কার্যক্রম এবং চূড়ান্ত রায় যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আইডি কার্ড ও শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাই

কারও মিডিয়া আইডির মেয়াদ শেষ হয়েছে কি না, পরিচয়পত্রের তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মেলে কি না এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা গঠনতন্ত্রের শর্ত পূরণ করে কি না—এসব বিষয়ও যাচাইয়ের দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দায়মুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।

একই প্রতিষ্ঠান থেকে পাঁচজনের বেশি সদস্য কীভাবে?

একই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান থেকে পাঁচজনের বেশি সদস্য বা প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন কি না—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে। তবে এটিকে অনিয়ম বলার আগে গঠনতন্ত্রে এ বিষয়ে গঠনতন্ত্রে কোন সীমাবদ্ধতা আছে কি না, তা প্রকাশ করা জরুরি। বিধান থাকলে সেটি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ঘিরে ১৮ অভিযোগ

সদস্য ও প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে ১৮টি অভিযোগ ও প্রশ্ন।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গঠনতন্ত্র প্রকাশ ও অনুসরণ না করেই নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া, নির্বাচনী আচরণবিধি লিখিতভাবে না দেওয়া, অর্থ গ্রহণের ক্ষেত্রে মানি রিসিট না দেওয়ার অভিযোগ, স্বতন্ত্র যাচাই-বাছাই কমিটি না করা, সদস্য ও প্রার্থীদের সঙ্গে পর্যাপ্ত মতবিনিময় না করা এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সমন্বয়কদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত উপস্থাপনের অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া নির্বাচনের আগে সব শর্ত লিখিতভাবে না জানানো, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর পুনরায় সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দেওয়া, নির্বাচনী ব্যয়ের কাঠামো আগে থেকে স্পষ্ট না করা এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের লিখিত রেকর্ড না থাকার অভিযোগও রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সময় ক্যামেরা বন্ধ রাখা, প্রার্থীদের কাছ থেকে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার পর নতুন শর্ত দেওয়া, নির্বাচন স্থগিতের কারণ ও পরবর্তী পরিকল্পনা স্পষ্ট না করা এবং যাচাই-বাছাইয়ের সময়সীমা নির্ধারণ না করার বিষয়ও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

এর পাশাপাশি চূড়ান্ত সদস্য ও প্রার্থী তালিকা নিয়ে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা না দেওয়া, নির্বাচনী ব্যয়ের দায় আগে থেকে স্পষ্ট না করা, দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণ নিয়ে পর্যাপ্ত লিখিত ব্যাখ্যা না থাকা এবং ইতোমধ্যে প্রার্থীদের ব্যয় হওয়া অর্থের দায় নিয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ রয়েছে।

স্ট্যাম্পে স্বাক্ষরের পর নতুন ছয় শর্ত কেন?

নির্বাচন প্রক্রিয়ার অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো—প্রার্থীদের কাছ থেকে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার পর অতিরিক্ত নির্বাচনী ব্যয়সহ ছয়টি নতুন শর্ত সামনে আসার অভিযোগ।

প্রার্থীদের প্রশ্ন, এসব শর্ত যদি নির্বাচন পরিচালনার জন্য বাধ্যতামূলক হয়, তাহলে মনোনয়ন গ্রহণের আগেই তা লিখিতভাবে জানানো হলো না কেন? তাদের দাবি, মাঝপথে নতুন শর্ত যুক্ত করতে হলে তা লিখিতভাবে প্রকাশ করতে হবে এবং সিদ্ধান্তের সাংগঠনিক ভিত্তিও স্পষ্ট করতে হবে।

গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় ক্যামেরা বন্ধ কেন?

চূড়ান্ত প্রার্থীদের নাম ঘোষণাকালে নির্বাচন সংক্রান্ত আলোচনা বা শর্ত উপস্থাপনের সময় ক্যামেরা বন্ধ করার অভিযোগও উঠেছে। প্রশ্ন হলো—কোন সিদ্ধান্তে, কার নির্দেশে এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার রেকর্ড বন্ধ করা হয়েছিল? সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্বাচন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত লিখিতভাবে সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যতে বিভ্রান্তি ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের সুযোগ কমে।

নির্বাচনী ব্যয়ের দায় কার ওপর বর্তাবে?

নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের অনেকে পোস্টার, ব্যানার, লিফলেট ও অনলাইন প্রচারণায় অর্থ ব্যয় করেছেন বলে জানিয়েছেন। এখন প্রশ্ন—নির্বাচনী কার্যক্রম মাঝপথে বন্ধ হলে ইতোমধ্যে ব্যয় হওয়া অর্থের দায় কার? শুধু মনোনয়ন বা প্রার্থিতা বাবদ অর্থ ফেরত দিলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? প্রচারণায় ব্যয় করা অর্থ যদি আর ফেরত পাওয়ার সুযোগ না থাকে তবে চূড়ান্ত দায় নির্ধারণের আগে প্রেসক্লাবের গঠনতন্ত্র, কমিশনের লিখিত সিদ্ধান্ত এবং প্রার্থীদের স্বাক্ষর করা নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে জানান প্রার্থীরা।

নির্বাচন স্থগিত হলে রোডম্যাপ কোথায়?

নির্বাচন স্থগিত বা দীর্ঘায়িত হলে সদস্য ও প্রার্থীদের সামনে স্পষ্ট রোডম্যাপ থাকা প্রয়োজন। কোন বিষয়গুলো যাচাই হবে, যাচাই শেষ হবে কবে, চূড়ান্ত সদস্য ও প্রার্থী তালিকা কবে প্রকাশ হবে এবং ভোটগ্রহণের সম্ভাব্য সময় কখন—এসব বিষয়ে লিখিত ঘোষণা দেওয়ার দাবি উঠেছে। কারণ অনিশ্চয়তা যত দীর্ঘ হবে, অবিশ্বাসও তত বাড়বে।

‘সিলেকশন নয়, চাই প্রকৃত ইলেকশন’

প্রার্থীদের একটি অংশের দাবি, কোনো পদে প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলেও যোগ্য প্রার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের বক্তব্য, প্রেসক্লাবের নির্বাচন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পছন্দের কমিটি তৈরির প্রক্রিয়া হতে পারে না। তাদের ভাষায়, “সিলেকশন নয়, চাই প্রকৃত ইলেকশন।”।তবে যেকোনো সিদ্ধান্ত অবশ্যই প্রেসক্লাবের গঠনতন্ত্র ও প্রযোজ্য নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

২০৭ সাংবাদিকের তালিকা নিয়েও প্রশ্ন

এদিকে স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি এলাকায় ২০৭ জন সাংবাদিকের তালিকা প্রকাশকে ঘিরেও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, গত কয়েক বছরে ওই এলাকায় একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক সক্রিয় সাংবাদিকের উপস্থিতি দেখা যায়নি। স্থানীয়দের একাংশের ভাষ্য, গত ১৭ বছরেও একসঙ্গে ৬০ জন সাংবাদিককে মাঠে দেখা যায়নি।

তাই ২০৭ জনের তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের সাংবাদিকতা, সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমে কর্মরত থাকার প্রমাণ, প্রকাশিত সংবাদ ও পেশাগত পরিচয় যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। তবে যাচাই ছাড়া কাউকে ‘ভুয়া সাংবাদিক’, অপরাধী বা অন্য কোনো নেতিবাচক পরিচয়ে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।

তালিকায় কারা আছেন—যাচাই কোথায়?

স্থানীয় সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, তালিকায় এমন কিছু ব্যক্তির নাম রয়েছে, যাদের মূল পেশা সাংবাদিকতা কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের মধ্যে ব্যবসায়ী, প্রতিষ্ঠানের মালিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ থাকার দাবিও করা হচ্ছে। অন্যদিকে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে—সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ কেউ সন্ত্রাস, মাদক ব্যবসা, অবৈধ ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইল কিংবা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকতে পারেন।

এসব অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। তাই অনুমান বা গুজবের ভিত্তিতে নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করাই হবে সঠিক পথ এমনটা মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নির্বাচন কমিশন কীভাবে সাংবাদিক পরিচয় যাচাই করল?

সাংবাদিকদের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের অস্তিত্ব, ব্যক্তির কর্মরত থাকার প্রমাণ, নিয়মিত প্রকাশিত সংবাদ, পেশাগত পরিচয় এবং প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন যাচাই করা হয়েছিল কি না—এ প্রশ্নও উঠেছে।

শুধু ব্যক্তিগত পরিচিতি বা স্থানীয় কোনো প্রত্যয়ন কি সাংবাদিক পরিচয়ের জন্য যথেষ্ট? এ প্রশ্নের উত্তরও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। কারণ সাংবাদিক পরিচয় শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়; এর সঙ্গে জড়িত পেশাগত দায়িত্ব ও জনস্বার্থের বিষয়।

হুমকি ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগ

এদিকে কদমতলী থানা প্রেসক্লাবের সভাপতি প্রার্থীসহ স্থানীয় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দকে লক্ষ্য করে হুমকি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। ক্লাবের অফিসিয়াল WhatsApp গ্রুপে সদস্য ও প্রার্থীরা এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নির্বাচন ও ক্লাবের পরিবেশ নষ্ট করতে কিছু ব্যক্তি বিশৃঙ্খলা ও ভাঙচুরের চেষ্টা করেছেন। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ক্লাবের কার্যক্রম ও নির্বাচন বানচাল এবং সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজন তৈরির উদ্দেশ্যে এসব ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী করা সমীচীন নয়।

‘হুমকি দিয়ে সাংবাদিকদের দমানো যাবে না’

ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে ক্লাবের সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে—“সাংবাদিকদের নিরপেক্ষতা ও সত্য প্রকাশের কণ্ঠকে স্তব্ধ করতেই একটি চিহ্নিত মহল এ ধরনের উসকানিমূলক কাজ করছে। আসন্ন নির্বাচনকে বানচাল করার উদ্দেশ্যে এসব করা হচ্ছে। কোনো ধরনের হুমকি বা ভাঙচুরের ভয় দেখিয়ে সাংবাদিকদের দমানো যাবে না।”

স্থানীয় থানা প্রশাসনকে বিভিন্ন বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে এবং ক্লাবের নিরাপত্তা জোরদার ও জড়িতদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

নারী দিয়ে হুমকির অভিযোগ, পাল্টা বক্তব্যও

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারীকে ব্যবহার করে হুমকি, আক্রমণাত্মক আচরণ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ তুলেছেন ক্লাবটির প্রচার সম্পাদক প্রার্থী মো. লিটন গাজী।

তার অভিযোগ, কিছু প্রার্থীর ইন্ধনে স্থানীয় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ, হুমকি-ধমকি ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে। কেউ এসবের প্রতিবাদ করলে নারী দিয়ে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার, মারমুখী আচরণ, গালিগালাজ এবং মামলা দিয়ে হয়রানির হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।

লিটন গাজীর দাবি, প্রার্থী ও সদস্যদের আতঙ্কে রেখে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভের উদ্দেশ্যে নারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি আরও দাবি করেন, এসব নারীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইল ও মামলা-বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অপরদিকে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী এই প্রার্থীর বিরুদ্ধেই আইসিটি মামলা, রাষ্ট্রদ্রোহী সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলা চলমান রয়েছে৷ তাদের দাবি, এসকল অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

মনোনয়ন কেনার টাকার উৎস নিয়েও অভিযোগ

স্থানীয় সূত্রের বরাতে আরও অভিযোগ আনা হয়, কিছু অসাধু ও বিতর্কিত ব্যক্তি নারীকে সামনে রেখে একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে অর্থ নেওয়ার পর সেই অর্থ দিয়ে মনোনয়ন কিনেছেন। এমনকি প্রেসক্লাবের নাম ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইল, সন্ত্রাস ও মামলা-বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। একজন সংবাদকর্মী এ বিষয়ে কদমতলী থানার ওসিকে মৌখিকভাবে অবহিত করেছেন এবং সংশ্লিষ্টদের অপরাধের কিছু তথ্য-প্রমাণ দেখানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের বিষয়।

রাজনৈতিক মামলার অভিযোগও সামনে

অভিযোগ রয়েছে, কথিত এই চক্রের কিছু ব্যক্তি আওয়ামী লীগের সহযোগী ছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে জুলাই হত্যাকাণ্ডসহ একাধিক মামলার অভিযোগ রয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা বা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলেই তা অপরাধ প্রমাণ করে না। আদালতের নথি, মামলার বর্তমান অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য যাচাই করেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত।

অভিযোগের পর প্রার্থিতা প্রত্যাহার সভাপতি প্রার্থী মাহমুদুল হাসানের

এদিকে এসব বিরোধের মধ্যে কদমতলী থানা প্রেসক্লাবের সভাপতি প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মাহমুদুল হাসান তার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। ক্লাবের অফিসিয়াল WhatsApp গ্রুপে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, তার কাছে নির্বাচন শুধু পদ বা জয়-পরাজয়ের বিষয় ছিল না। তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ সাংবাদিক সংগঠন গড়ে তোলার প্রত্যাশা করেছিলেন।

তবে তার দাবি, তাকে নিয়ে প্রচার সম্পাদক প্রার্থী লিটন গাজী গ্রুপে অসত্য, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য দিয়েছেন। মাহমুদুল হাসানের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি কারও সঙ্গে বিবাদে যেতে চান না। অভিযোগ থাকলে প্রমাণসহ প্রকাশ্যে বলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রমাণ ছাড়া ব্যক্তিগত আক্রমণ বা চরিত্রহনন গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি আরও জানান, তার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কারও ভয় বা চাপের কারণে নয়; এটি তার নিজের বিবেকের সিদ্ধান্ত। তার ভাষায়, “পদ হারানো কোনো মানুষের পরাজয় নয়। কিন্তু বিবেক হারানোই মানুষের সবচেয়ে বড় পরাজয়।” তিনি স্পষ্ট করেন, নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেও সাংবাদিকতা ও সত্যের পক্ষে তার অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন না।

সভাপতি প্রার্থী মাহমুদুল হাসানের পাশে ক্লাবের সাংবাদিকরা

ক্লাবটির তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক পদপ্রার্থী খালিদ কাউসার সহ অন্যান্য প্রার্থীরা মাহমুদুল হাসানের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, নির্বাচনে মতের পার্থক্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতেই পারে। কিন্তু একজন সহকর্মীর সম্মানহানি হয়—এমন বক্তব্য দেওয়ার আগে সত্যতা যাচাই ও প্রমাণ থাকা জরুরি। তার মতে, পদ-পদবির চেয়ে সহকর্মীর সম্মান বড়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচন যেন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও পেশাদারিত্বের উদাহরণ হয়—“মতভেদ থাকুক, কিন্তু মিথ্যাচার ও ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়।”

নতুন বিতর্ক
নির্বাচন ছাড়াই নির্বাচিত সভাপতি ঘোষণা সরকার জামালের

কদমতলী থানা প্রেসক্লাবের নির্বাচন ঘিরে চলমান বিতর্কের মধ্যেই ভোটগ্রহণের আগেই সভাপতি ও অন্যান্য পদে ব্যক্তিদের ‘নির্বাচিত’ ঘোষণা করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে প্রশ্ন, ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সদস্যদের প্রশ্ন—ভোটই যদি না হয়, তাহলে কোন প্রক্রিয়ায় এবং কার সিদ্ধান্তে কাউকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হচ্ছে?

অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচন আয়োজনের জন্য সদস্য ও প্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে। সেই অর্থ নেওয়ার উদ্দেশ্য এবং নির্বাচন না হলে তা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে পছন্দের ভোটার তৈরির উদ্দেশ্যে অর্থ নেওয়া হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রার্থীদের অসৌজন্যমূলক আচরণ, নিবন্ধনহীন মিডিয়ার সম্পৃক্ততা, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, ব্যবসায়ী ও একই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান থেকে একাধিক প্রার্থীসহ বিভিন্ন অভিযোগ ও প্রশ্ন সামনে আনার কথা বলা হয়েছে। এসব অভিযোগের নিষ্পত্তি না করে নির্বাচন প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে সরাসরি পদ ঘোষণা করার অধিকার বা বৈধতা কারা দিয়েছে—এ প্রশ্নও তুলছেন সদস্যরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অভিযোগ উঠলে প্রথমে তার স্বচ্ছ তদন্ত ও নিষ্পত্তি প্রয়োজন। কিন্তু ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের কথা থাকলেও ভোট ছাড়াই পদ ঘোষণা করা হলে সদস্যদের ভোটাধিকার ও পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এদিকে কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক দলের সক্রিয় পদে থেকে সাংবাদিকদের সংগঠনের নেতৃত্ব বা কার্যক্রমকে ব্যক্তিগত কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করলে সেটিও গ্রহণযোগ্য নয় বলে মত দিয়েছেন অনেকে। সাংবাদিকদের সংগঠন কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি কিংবা কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্ল্যাটফর্ম নয়। নেতৃত্ব নির্ধারণে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি এবং সদস্যদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ।

সদস্যদের অভিযোগ, নির্বাচন ছাড়াই পদ ঘোষণা করা হলে তা শুধু ভোটাধিকারকে উপেক্ষা করবে না; ভবিষ্যতে অনিয়মের দৃষ্টান্তও তৈরি করবে। তাই তাদের দাবি—কোনো পক্ষের পছন্দের ব্যক্তিকে নেতৃত্বে বসানোর পরিবর্তে প্রথমে নির্বাচনকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে। পাশাপাশি বৈধ ভোটার তালিকা যাচাই, সদস্যদের মতামত গ্রহণ, প্রার্থী ও সদস্যদের সমান সুযোগ নিশ্চিত এবং সবার অংশগ্রহণে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।

গণস্বাক্ষর করে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার উদ্যোগ স্থানীয় সাংবাদিকদের

এদিকে নির্বাচনের আগেই সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে নিজেদের ‘নির্বাচিত’ হিসেবে প্রচার-প্রচারণার অভিযোগে স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি অংশ গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন।

তাদের বক্তব্য, এভাবে প্রচার চালানো হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সাংবাদিকদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে তারা কোন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি। বিষয়টি পরিষ্কার করতে তাই কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সাংবাদিকদের ভাষ্য, “ভোট না হলে কেউ নির্বাচিত নন। যারা নিজেদের নির্বাচিত হিসেবে প্রচার করছেন, তারা স্বঘোষিত পদধারী। আমরা নীরব থাকলে এই ধারণাই একসময় সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তাই গণস্বাক্ষরসহ লিখিতভাবে বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”

এখন মূল প্রশ্ন—নির্বাচন হবে, নাকি ভোট ছাড়াই পদ ঘোষণা করা হবে? সদস্যদের ভোটাধিকার ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছেন কদমতলী থানা প্রেসক্লাবের সদস্যরা।

স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করতে ১২ দফা প্রস্তাব:

সংশ্লিষ্ট প্রার্থী ও সদস্যদের পক্ষ থেকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে ১২ দফা সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

১. গঠনতন্ত্র প্রকাশ

প্রেসক্লাবের বর্তমান ও কার্যকর গঠনতন্ত্র সদস্যদের সামনে প্রকাশ করতে হবে।

২. বৈধ সদস্য তালিকা প্রকাশ

সকল সদস্যের তালিকা প্রকাশ করে প্রয়োজন হলে পুনঃযাচাই করতে হবে।

৩. সদস্যপদ প্রদানের প্রক্রিয়া স্পষ্ট করা

কে কীভাবে সদস্য হয়েছেন এবং সদস্যপদের যোগ্যতা কী—তা লিখিতভাবে জানাতে হবে।

৪. প্রার্থীদের যোগ্যতা পুনঃযাচাই

সাংবাদিক পরিচয়, কর্মরত প্রতিষ্ঠান, আইডি কার্ড, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও গঠনতান্ত্রিক শর্ত যাচাই করতে হবে।

৫. লিখিত নির্বাচনী আচরণবিধি

নির্বাচনের আগে আচরণবিধি লিখিতভাবে প্রকাশ করতে হবে এবং সব প্রার্থীকে তার কপি দিতে হবে।

৬. সব নির্বাচনী শর্ত আগেই জানানো

মনোনয়ন গ্রহণের আগে নির্বাচনসংক্রান্ত সব শর্ত প্রার্থীদের লিখিতভাবে জানাতে হবে। মাঝপথে নতুন শর্ত আরোপ হলে তার সাংগঠনিক ভিত্তি প্রকাশ করতে হবে।

৭. নির্বাচনী বাজেট প্রকাশ

নির্বাচনের সম্ভাব্য আয়-ব্যয় ও বাজেট সদস্যদের সামনে প্রকাশ করতে হবে।

৮. নির্বাচনী ব্যয়ের দায় নির্ধারণ

নির্বাচন স্থগিত, বাতিল বা পরিবর্তিত হলে প্রার্থীদের ইতোমধ্যে হওয়া ব্যয়ের দায় কীভাবে নির্ধারণ হবে—তা আগেই লিখিত করতে হবে।

৯. ক্লাবের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ

মাসিক ও এককালীন আয়-ব্যয়ের হিসাব সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে।

১০. সদস্য ও প্রার্থীদের মতামতের সুযোগ

গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রার্থী ও সদস্যদের মতামত গ্রহণের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

১১. পরিচালনা কাঠামো স্পষ্ট করা

পরিচালনা বোর্ড, উপদেষ্টা পরিষদ ও নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা ও দায়িত্ব লিখিতভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

১২. নতুন কমিটির ৩ মাসের কর্মপরিকল্পনা

নির্বাচনের পর নতুন কমিটির প্রথম তিন মাসের কর্মপরিকল্পনা সদস্যদের সামনে প্রকাশ করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

অভিযোগের নিষ্পত্তি হোক তদন্তে

নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিরোধ, ব্যক্তিগত আক্রোশ কিংবা গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব থাকতেই পারে। কিন্তু সেগুলো যেন সদস্যপদ বা প্রার্থিতা নির্ধারণের ভিত্তি না হয়। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—দুই পক্ষের বক্তব্য নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আদালতের নথি থেকে তথ্য সংগ্রহ করা উচিত। এরপর চূড়ান্ত তালিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে—কে যোগ্য, কে অযোগ্য এবং কার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। এতে ব্যক্তিগত অপবাদ ও গুজবের পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত হবে।

পরিশেষে—এবার নির্বাচন হবে, নাকি বিভাজন?

কদমতলী থানা প্রেসক্লাবের সংকট এখন আর শুধু কে সভাপতি, কে সম্পাদক বা কে কোন পদে জয়ী হবেন—সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে—সদস্য তালিকা কতটা বৈধ? প্রার্থীদের যোগ্যতা কীভাবে যাচাই হয়েছে? সাংবাদিক পরিচয়ের সত্যতা কীভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে? গঠনতন্ত্র ও আচরণবিধি কোথায়? নির্বাচনের আগে নতুন শর্ত কেন? প্রার্থীদের ব্যয়ের দায় কে নেবে? নির্বাচন কমিশন মাঝপথে সরে দাঁড়ানোর কারণ কী? নির্বাচন ছাড়াই পদ ঘোষণা করার সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী? এবং সবচেয়ে বড় কথা—একটি প্রেসক্লাবের নির্বাচন করতে গিয়ে যদি একাধিক প্রেসক্লাব তৈরির পরিস্থিতি হয়, তাহলে সেই বিভাজনের দায় কার?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাল্টাপাল্টি অভিযোগে নয়; প্রয়োজন গঠনতন্ত্র, সদস্য তালিকা, মনোনয়নসংক্রান্ত নথি, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত, সভার কার্যবিবরণী ও আর্থিক হিসাব প্রকাশ করে নিরপেক্ষ পর্যালোচনা। কারণ একটি প্রেসক্লাবের নির্বাচন শুধু কয়েকটি পদে জয়-পরাজয়ের বিষয় নয়। এটি সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, সংগঠনের ঐক্য, গণতান্ত্রিক চর্চা, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ সাংবাদিক সমাজের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। তাই এখন প্রয়োজন কাউকে জেতানো বা কাউকে হারানো নয়—প্রথমে সত্য উদঘাটন, নিয়ম স্পষ্ট করা এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।

তারপরই হোক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন।

এখন কদমতলী থানা প্রেসক্লাবের সদস্যদের অপেক্ষা—শেষ পর্যন্ত নেতৃত্ব নির্ধারণ হবে ভোটে, নাকি ভোট ছাড়াই?

ইএসবি/নিউজ

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© 2026 All rights reserved © eisomoyebangladesh
কারিগরি সহযোগিতায়: Bangla Webs
ThemesBazar-Jowfhowo