নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নিয়োগ-পদায়ন বাণিজ্য, বিভিন্ন বড় প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি, টেন্ডার কমিশন এবং চার দেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারসহ বিস্তর অভিযোগ খতিয়ে দেখতে মাঠে নামছে সংস্থাটি ।
আজ রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) দুপুরে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন । তিনি জানান, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই একটি অভিযোগের অনুসন্ধান চলছিল । নতুন করে প্রাপ্ত এই বিশাল অঙ্কের দুর্নীতির অভিযোগগুলো চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গেই সংযুক্ত করে যৌথভাবে তদন্তের অনুমোদন দিয়েছে কমিশন ।
বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের খতিয়ান
প্রাপ্ত অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বড় খতিয়ানটি হলো বিদেশে অর্থপাচারের। সুনির্দিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের চার দেশে মোট ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে । এর মধ্যে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে । এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে বিভিন্ন দেশে বিলাসবহুল ভিলা ক্রয়, পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের ‘গ্রিন গ্রুপে’ বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার তথ্য উঠে এসেছে । অভিযোগে দাবি করা হয়, আসিফ মাহমুদের দুই ভগ্নিপতি ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে এই অর্থ দেশের বাইরে পাঠানো হয়েছে ।
ডিসি ও প্রশাসক নিয়োগে কোটি কোটি টাকার লেনদেন
প্রশাসনিক খাতে নিয়োগ ও পদায়নকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে । এছাড়া সারা দেশে ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে ২ কোটি থেকে শুরু করে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুস লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে । ৩৬ জনের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ অঙ্কের হিসাবে এখানে সম্ভাব্য লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৭২ কোটি থেকে ৩৬০ কোটি টাকা, যা দুদক যাচাই করে দেখবে ।
উচ্চপদে ঘুস ও প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি
উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে । এছাড়া ঢাকা ওয়াসার এমডি হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিয়ে ১০ কোটি টাকা, এলজিইডির সাবেক চিফ ইঞ্জিনিয়ার আব্দুর রশীদ খানকে ৫২ কোটি টাকা এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সিইও পদে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগ দেওয়ার বিনিময়ে ৬৫ কোটি টাকা ঘুস নেওয়ার অভিযোগও খতিয়ে দেখছে দুদক।
পাশাপাশি শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার আবেদন জমা পড়েছে । এমনকি আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ৪৫৩ কোটি টাকার বরাদ্দ ও অর্থ গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে ।
পারিবারিক সিন্ডিকেট ও ক্ষমতার অপব্যবহার
আবেদনে আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন ও সাবেক এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ঠিকাদার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর অবৈধ প্রভাব খাটানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। তার পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঘুস লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া হেলিকপ্টারে কম্বল বিতরণ করে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়, বিমানবন্দরে গুলিভর্তি ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ এবং পাঁচ তারকা হোটেল ওয়েস্টিনে নিয়মিত যাতায়াত ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট-গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টিও অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে।
আগের অনুসন্ধানের সাথে সংযুক্তি
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর আসিফ মাহমুদসহ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মাহবুব-উল-আলম, যুগ্মসচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মাসুম আহমেদের বিরুদ্ধে পৃথক একটি অনুসন্ধান শুরু করেছিল দুদক । সেখানে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের টেন্ডার সিন্ডিকেট এবং উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাদের পদায়ন ও পদোন্নতিতে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের প্রাথমিক তথ্য ছিল। দুদকের ৪ সদস্যের একটি বিশেষ টিম আগের অভিযোগের তদন্ত করছে, যার সাথে এখন নতুন এই বহুমাত্রিক দুর্নীতির তথ্য যুক্ত করে বড় পরিসরে অনুসন্ধান চালানো হবে।
অভিযোগ অস্বীকার ও আসিফ মাহমুদের বক্তব্য
এদিকে দুদকের এই অনুসন্ধানকে সম্পূর্ণ ‘রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং মিথ্যা বলে দাবি করেছেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া । তাঁর দাবি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি করা এবং গণমাধ্যমে তার নামে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্যই এই ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ চালানো হচ্ছে । তিনি যেকোনো আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন।