সামছুদ্দোহা সোহাগঃ
রাষ্ট্রীয় সমাজে ব্যক্তি বদলে, দল বদলে, কাঙ্খিত অর্থনৈতিক ফল মেলে না, দৃষ্টিগ্রাহ্য ফল মেলে প্রচলিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো বদলে। একটি দেশের অর্থনীতির ওপর সেই দেশের মানুষের ধর্ম, নীতি, সংস্কৃতি ও রাজনীতি নির্ভরশীল বিধায় কেবলমাত্র অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের দ্রুত প্রসারের মাধ্যমেই রাষ্ট্রের সামগ্রীক কাঠামো বদলে দেওয়া সম্ভব। অর্থনীতিকে বদলাতে হলে সামাজিক মানুষের জীবনমান, শ্রম ও শ্রমের মূল্য বদলাতে হবে। সম্পদ মুষ্ঠীমেয় কিছু লোকের হাতে সীমাবদ্ধ রাখার রাষ্ট্রীয় মানসিকতা পরিহার করে প্রান্তিক মানুষের নাগালে পৌঁছানোর মানসিকতা তৈরি করতে হবে। উৎপাদনকারির উৎপাদনের, শ্রমিকের শ্রমের ন্যায্য মূল্য পরিশোধের পর লাভের প্রত্যাশা করলে রাষ্ট্রীয় সমাজে উৎপাদন ও শ্রমের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠীত হবে। এমনই নীতি সঠিক বাস্তবায়ন হলে বিনিয়োগকারির প্রত্যাশীত লাভ আজ না হোক, কাল হবেই। বৃদ্ধি পাবে অর্থনৈতিক গতিশীলতা। ব্যক্তি ও সমাজ থেকে রাষ্ট্রীয় সমাজের পরিবর্তন পরিবর্ধন হবে। গড়ে উঠবে উন্নত সমাজ ও রাষ্ট্র। এটিই সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যতার পূর্বশর্ত। শুধুমাত্র দেশি কিংবা বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জন্য মসৃণ প্রবৃদ্ধি নিশ্চত করে না- নিশ্চিত করে সাধারণ মানুষের স্বার্থরক্ষা, সহায়ক সুনীতি ও সিস্টেমের ওপর। বিনিয়োগকারি ও শ্রমিকের শ্রেণিসংঘাত আধুনিক মানুষকে নিয়ে যায় সামন্ততান্ত্রিক সমাজে। এতে বিভাজন হয় অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির উঠানে। রাজনীতির স্বার্থে রাজনীতিকের লক্ষ্য যদি হয় ‘দারিদ্র্য উৎপাদন’ তা’ হলে অর্থনীতি এখানেই শেষ। অধিকাংশ রাজনীতিক মনে করেন, দরিদ্রমানুষ তাদের রাজনীতির সম্পদ। তার কারণ- ভোটের বাজারে ভোট অর্জনে দরিদ্রমানুষ কাজ দেয় বেশি। সম্পদের উৎপাদন করে কারা, বন্টন করে কারা এবং কারা সম্পদ জমায় ও কেন জমায় এই প্রশ্নের উত্তর যদি রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সঠিকভাবে সাজানো থাকে, সম্পদ কেন্দ্রীভূত করার সঠিক সুনীতিমালা রাষ্ট্রীয়কাঠামোতে সুনির্দিষ্ট থাকে, রাষ্ট্রীয় পুঁজি কতিপয় ব্যক্তিবিশেষ বা গোষ্ঠীর হাতে না থেকে সামগ্র রাষ্ট্রের মানুষের নাগালে থাকে, তবেই গড়ে উঠবে উন্নত রাষ্ট্রীয় সমাজ ও সংস্কৃতি। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে অনেকেই বলে থাকেন, আমার মতে, ইতিহাস সিস্টেমকে পাল্টায় না- সিস্টেম ইতিহাসকে পাল্টায়। অতএব ইতিহাস বেশি না ঘেঁটে অনেক বেশি করে ঘাঁটা দরকার সিস্টেম। মনে রাখা প্রয়োজন- ক্ষমতা শুধু টাকায় না, ক্ষমতা আইনেও থাকে, ক্ষমতা সুশিক্ষায়ও থাকে, নির্মলসংস্কৃতি ও অবাধ তথ্যপ্রবাহযুক্ত মিডিয়াতেও থাকে ক্ষমতা। স্থিতিশীল ও আশাবাদী ভবিষ্যতের দিকে চাইলে উৎপাদনকারীর দোরগোড়ায় উৎপাদিত পণ্য-দ্রব্যের সঠিক মূল্য পৌঁছায় না কেন, শ্রমিকের ঘরে শ্রমের সঠিকমূল্য পৌঁছায় না কেন, এর সঠিক উত্তর বের করে তার সমাধান রাষ্ট্রীয়কাঠামোতে সাজাতে হবে আগে। অর্থনীতিবিদগণের মতে, দুর্নীতির কারণে ব্যাপক বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি হারাচ্ছে বাংলাদেশ। তাই শ্রেণিশোষণমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে দুর্নীতির শিকড় উপশিকড় খুঁজে বের করে সমূলে উৎপাটনের চেষ্টা করতে হবে। অনেকের মতে, দুর্নীতির জন্য প্রধানত দায়ী কিছু অসাধু আমলা- কামলা ও রাজনীতিকরা। তাদের কাজের আওতায় সাধারণত উন্নয়নের প্রজেক্টগুলো থাকে এবং স্বভাবতই উন্নয়নের বাজারে দুর্নীতি হয় বেশি। অর্থনীতিকগণ এটি চিহ্নীত করেছেন।দুর্নীতির লালনকল্পে অনুৎপাদনশীল খাতে রাষ্ট্রীয় সীমিত সম্পদ ব্যবহার করায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিনের পর দিন তলানীতে ঠেকছে। তাই দ্বিতীয় ধাপে দুর্নীতি নির্মূলে দৃষ্টি আবশ্যক। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে দুর্নীতির আশ্রয়-প্রশ্রয় কমে যাবে অনেকাংশে। এই লক্ষ্যে রাজনীতিকে দেশপ্রেমিক, সৎ ও দক্ষ রাজনীতিকদের হাতে রাখা দরকার। শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীর হাতে রাজনীতি থাকলে রাজনীতিতে সেবার বদলে কেবলই মুনাফার মাপকাঠি নির্ধারিত হবে। যেমন- দেশে বেসরকারি গণমাধ্যমগুলো ব্যবসায়ীদের কব্জায় চলে যাওয়ায় সেখানে অবাধ তথ্যপ্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে, যার ফলে নীতিমালা বিসর্জন দিয়ে মুনাফার দিকে ঝুঁকে পড়েছে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা। এতেকরে গণমাধ্যমকর্মীরা তাদের পেশাদারিত্বের স্বচ্ছতা হারিয়ে সম্মানের বদলে বদনামের শিকার হচ্ছে এবং গণমাধ্যমগুলো দেশবাসীর আস্থা হারাচ্ছে।