এ কে এম নাজিম হোসেন:
দেশে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সাথে সাথে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে সাইবার অপরাধ। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সাইবার বিভাগের সর্বশেষ তদন্তে দেশের সাইবার জগতকে অস্থিতিশীল করে তোলা তিন শতাধিক সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রকে শনাক্ত করা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা এআই এবং আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে এই চক্রগুলো সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিনিয়ত ফাঁদ পাতছে।
অপরাধের ভয়াবহ পরিসংখ্যান ও বর্তমান চিত্রগোয়েন্দা পুলিশ ও সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে তথ্য ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২, ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর অধীনে মোট ৪ হাজার ৭৯৪ টি মামলা দায়ের হয়েছে। কিন্তু পৃথক সাইবার অপরাধ ইউনিট না থাকায় এইসব মামলায় সঠিক তদন্ত নিষ্পত্তি ও নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ করা হয়েছে। সিআইডি সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, বর্তমানে সিআইডি সাইবার পুলিস সেন্টারে ২৯৮ টি মামলা তদন্ত দিন রয়েছে।এর মধ্যে ৬৫১ টি সাধারণ ডায়েরি (GD) এবং ৭২০ টির বেশি অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চলছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই ঢাকা মহানগরীতে ১,০৯৪টি সাইবার-সম্পর্কিত (GD) এবং ৭৩টি নতুন মামলা দায়ের হয়েছে।
দেশের সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পোর্টাল, ওয়েবসাইট এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর ক্রমাগত সাইবার হামলার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।বর্তমানে অপরাধের ধরনে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা:এআই এবং ডিপফেক প্রযুক্তি: অপরাধীরা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে হুবহু কণ্ঠস্বর নকল (Voice Cloning) করছে এবং ডিপফেক ভিডিও বানিয়ে সাধারণ মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করছে।এমএফএস ও ডিজিটাল বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো মোবাইল আর্থিক সেবাকে লক্ষ্য করে ওটিপি (OTP) ও পিন হাতিয়ে নেওয়ার চক্রগুলো আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
অনলাইন জুয়া এবং ডিজিটাল হুন্ডির কারণে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) প্রায় ৫৫,০০০ এমএফএস অ্যাকাউন্ট স্থগিত করেছে।সোশ্যাল মিডিয়া হ্যাকিং ও ব্ল্যাকমেইল: ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং এখন সাইবার অপরাধের শীর্ষে (২১.৬৫%)। গবেষণায় দেখা গেছে, ভুক্তভোগীদের প্রায় ৬০ শতাংশই তরুণী ও নারী, যারা সাইবার বুলিং ও পর্নোগ্রাফির শিকার হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক সাইবার স্ক্যাম: মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া বা লাওসের মতো দেশগুলোতে তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক স্ক্যাম সেন্টারে বাংলাদেশিদের পাচার করে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।প্রতিরোধে সরকারের কঠোর অবস্থান ও নতুন আইনপরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার আইন ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার এবং সাইবার অপরাধে জড়িতদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।
সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৬: পূর্ববর্তী বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধন করে পাস করা হয়েছে নতুন ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৬’। এই আইনে অনুমতি ছাড়া কারও ভিডিও বা অডিও ধারণ ও এআই-এর মাধ্যমে বিকৃত কন্টেন্ট তৈরিকে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড। অনলাইন জুয়াকেও এই আইনের আওতায় এনে ফৌজদারি অপরাধ করা হয়েছে।
বিশেষায়িত সাইবার পুলিশ ইউনিট: ডিজিটাল অপরাধের এই বিশাল ঢেউ সামাল দিতে সরকার একটি পৃথক এবং ডেডিকেটেড ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ ও স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট (SSU) গঠনের চূড়ান্ত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সাইবার অপরাধ ও মানি লন্ডারিং রোধে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক এবং র্যাব যৌথভাবে তথ্য আদান-প্রদান ও ক্র্যাকডাউনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মত কেবল আইন প্রয়োগ করে এই অপরাধ দমন সম্ভব নয়।”ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সাধারণ জনগণের মধ্যে সাইবার সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে কোনো অচেনা লিংকে ক্লিক না করা এবং নিজের ব্যক্তিগত তথ্য বা ওটিপি শেয়ার না করার বিষয়ে সবাইকে সতর্ক হতে হবে। দেশের সাইবার জগতকে এই তিন শতাধিক অপরাধী চক্রের কবল থেকে মুক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি এখন সর্বস্তরের নাগরিক সচেতনতাই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।