বিশৃঙ্খলা যেন থামছেই না কদমতলী থানা প্রেসক্লাবের নির্বাচনকে ঘিরে!
নাম ঘোষণা থামিয়ে ভিডিও বন্ধ, নতুন ৬ শর্তে উত্তপ্ত বিতর্ক ; সভা ত্যাগ নির্বাচন কমিশনের। মনোনয়ন ও ক্লাবের সদস্যপদ প্রত্যাহারের ঘোষণা প্রার্থীদের…
ইবনে ফরহাদ তুরাগ: কদমতলী থানা প্রেসক্লাবের আসন্ন দ্বি-বার্ষিক নির্বাচনকে ঘিরে চলমান বিতর্কের মধ্যেই এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে নির্বাচন কমিশনের একটি ভুল সিদ্ধান্ত। এবার চূড়ান্ত প্রার্থীদের নাম ঘোষণা চলাকালে ভিডিও রেকর্ডিং বন্ধ রেখে নতুন ৬টি শর্ত উপস্থাপনের অভিযোগ উঠেছে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে।
এসব শর্তের বৈধতা ও গঠনতান্ত্রিক ভিত্তি নিয়ে কয়েকজন প্রার্থী প্রশ্ন তুললে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে তাদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। একপর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা সভা ত্যাগ করেন। এরপর কয়েকজন প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পাশাপাশি ক্লাবের সদস্যপদ থেকেও সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। এতে আগামী ১৪ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে গেছে বলে দাবি বিভিন্ন সাংবাদিক মহলের।
সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগষ্ট (সোমবার) রাতে চূড়ান্ত প্রার্থীদের নাম ঘোষণার জন্য নির্বাচন কমিশনের আহ্বানে প্রার্থীরা নির্ধারিত সময়ে সেখানে উপস্থিত হন। মোট ৩৫ জন প্রার্থীর মধ্যে উপস্থিত ২৪ জনের কাছ থেকে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। অনুপস্থিতদের কাছ থেকে পরদিন স্বাক্ষর নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।
স্বাক্ষর গ্রহণ শেষে নির্বাচন কমিশন একে একে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা শুরু করে। তবে ৭ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণার পর কার্যক্রম হঠাৎ স্থগিত করা হয়। এরপর উপস্থিত সবাইকে ভিডিও রেকর্ডিং বন্ধ করতে অনুরোধ জানানো হয়। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পরবর্তী আলোচনা ক্লাব-সংশ্লিষ্ট একটি ‘আনঅফিসিয়াল’ বিষয় হওয়ায় তা ভিডিও ধারণ না করার অনুরোধ করা হচ্ছে।
প্রার্থীদের অভিযোগ, ভিডিও রেকর্ডিং বন্ধ হওয়ার পর তখন নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ৬টি নতুন প্রস্তাব উপস্থাপন করা। কমিশন জানায়—নির্বাচনী অতিরিক্ত ব্যয় প্রার্থীদের বহন করতে হবে। ক্লাব পরিচালনায় অতিরিক্ত ব্যয় হলে সেটিও প্রার্থীদের বহন করতে হবে। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হলে এক মাসের মধ্যে ক্লাবের জন্য একটি অফিসের ব্যবস্থা করতে হবে। অফিস ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয় নির্বাহের লক্ষ্যে কয়েকটি অটোরিকশা কেনার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়। পাশাপাশি ক্লাবের উন্নয়ন ও সার্বিক দায়িত্ব বিজয়ী প্যানেলকে নিতে হবে এবং নির্বাচনের পর কোনো প্রার্থী ভুল তথ্য দিয়ে থাকলে নির্বাচন কমিশন তার পদ বাতিল করতে পারবে বলেও জানানো হয়।
প্রার্থীদের দাবি, এসব বিষয় তখনই উপস্থাপন করা হয়, যখন তারা ইতোমধ্যে মনোনয়নপত্র জমা, নির্ধারিত ফি পরিশোধ এবং স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর সম্পন্ন করেছেন। ফলে নতুন শর্তগুলো নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ অনেকের ছিল না। তবে এ বিষয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল বলে তারা জানান।
শর্ত ঘোষণার পর আলোচনার একপর্যায়ে কয়েকজন প্রার্থী জানতে চান, এসব শর্ত আগে কেন জানানো হয়নি এবং হঠাৎ এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি কী? সেই মুহূর্তে তারা ক্লাবের গঠনতন্ত্র ও নির্বাচন পরিচালনার বিধিমালা ও বাজেটও দেখতে চান। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। উপস্থিত একাধিক ব্যক্তির দাবি, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা সভা ত্যাগ করেন। উপস্থিত সদস্য ও প্রার্থীদের ‘সরি’ বলে অনুরোধ করা সত্ত্বেও তারা আলোচনায় ফিরে আসেননি। বরং নির্বাচন পরিচালনা করবেন কি না, সে বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে সভাস্থল ত্যাগ করেন।
এরপর থেকেই একের পর এক প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পাশাপাশি ক্লাবের সদস্যপদ থেকেও পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এতে নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যায়।
এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেশ কিছু প্রার্থী মুখ খুলতে আপত্তি জানালেও কয়েকজন প্রার্থী ও সদস্যদের ভাষ্যমতে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে গণমাধ্যমের কাছে। তাদের অভিযোগ—প্রার্থীদের নাম ঘোষণা চলাকালে ভিডিও রেকর্ডিং কেন বন্ধ করা হলো? মনোনয়নপত্র জমা ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষরের পর নতুন শর্ত উপস্থাপনের প্রয়োজন কেন দেখা দিল? নির্বাচনী ব্যয় ও অতিরিক্ত ব্যয় প্রার্থীদের ওপর আরোপের সিদ্ধান্ত কোন গঠনতান্ত্রিক ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে? নির্বাচিত প্রতিনিধির পদ বাতিলের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া সদস্যদের জমাকৃত অর্থের মানি রিসিট কোথায়, সদস্যদের তালিকা প্রকাশের পর কেন শিক্ষাগত সনদ চাওয়া হলো, সদস্যপদ গ্রহণের আগে তা কেন যাচাই করা হয়নি, ক্লাবের গঠনতন্ত্র ও নির্বাচনী আচরণবিধি কেন সদস্যদের সরবরাহ করা হয়নি, নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য কারা, অডিট কর্মকর্তা কে এবং নির্বাচনী বাজেট ও আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ নিয়েও প্রশ্নও তুলেছেন তারা।
এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কমিশনের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।

প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র ও সদস্য পদ প্রত্যাহার; নির্বাচন স্থগিত সংক্রান্ত জরুরী বিজ্ঞপ্তি
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, গত বুধবার (৫ আগষ্ট) রাতে কদমতলী থানা প্রেসক্লাব এর অফিসিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পাঠানো “নির্বাচন স্থগিত সংক্রান্ত একটি জরুরী বিজ্ঞপ্তিতে: প্রার্থিতা প্রত্যাহার, অভিযোগ যাচাই ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা—তিন কারণ দেখিয়ে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কদমতলী থানা প্রেস ক্লাবের নির্বাচন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন।”

কদমতলী থানা প্রেস ক্লাবের নির্বাচনী ইস্যু সহ চলমান বিষয় নিয়ে জরুরি আলোচনায় নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় আজ শুক্রবার বাদ জুমা, শনির আখড়ার গ্রামীণ চাইনিজে।
প্রসঙ্গত, কদমতলী থানা প্রেসক্লাবের আসন্ন দ্বি-বার্ষিক নির্বাচন- ২০২৬ কে কেন্দ্র করে একের পর এক বিতর্কের পর এবার নতুন করে দেখা দিয়েছে স্বচ্ছতা ও গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন।
ক্লাবের একাধিক সদস্যের মতে, এবারের নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্ট সংকট দ্রুত সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করা না হলে সাংবাদিকদের ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সংগঠনের ভাবমূর্তিও নষ্ট হতে পারে।
তারা গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে স্বচ্ছ, আলোচনার মাধ্যমে সকলের অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান।
ইএসবি/নিউজ