কলম যখন দলীয় পরিচয়ে বন্দি
সাংবাদিকদের কলম: রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র, নাকি সত্যের কণ্ঠস্বর?
ইবনে ফরহাদ তুরাগ: সাংবাদিকতা একটি সত্য অনুসন্ধানের পেশা, আর দলীয় রাজনীতি নির্দিষ্ট আদর্শ ও দলের প্রতি আনুগত্যের জায়গা। এই দুই ভিন্ন পরিচয় যখন একই ব্যক্তির মধ্যে মিশে যায়, তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে—সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা কতটা অক্ষুণ্ন থাকে?
একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার বিশ্বাসযোগ্যতা। তিনি কোনো দলের মুখপাত্র নন, কোনো ব্যক্তির প্রচারকও নন। তার দায়িত্ব হলো তথ্য যাচাই করা, সত্য তুলে ধরা এবং জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু একজন সাংবাদিক যখন সক্রিয়ভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হন, তখন তার সংবাদ ও মতামতের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তখন প্রশ্ন থেকে যায়, দলের কোনো ভুলের বিরুদ্ধে তখন কি তিনি আগের মতো স্বাধীনভাবে কলম ধরতে পারবেন? দলের কোনো নেতা বা সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলে কি তার রাজনৈতিক অবস্থান বাধা হয়ে দাঁড়াবে? আবার দলের পক্ষে কোনো সংবাদ বা বক্তব্য প্রকাশ করলে পাঠক কীভাবে নিশ্চিত হবেন—এটি সাংবাদিকতার দায়িত্ব থেকে করা হয়েছে, নাকি দলীয় আদর্শ ও আনুগত্য থেকে?
এখানেই তৈরি হয় মূল সংকট
অবশ্যই একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে। তিনি কোনো দলকে পছন্দ করতেই পারেন, রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনা রাখতেই পারেন। কিন্তু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাস আর সক্রিয় দলীয় রাজনীতি এক বিষয় নয়। একজন সাংবাদিক যখন কোনো দলের পদ-পদবি গ্রহণ করেন, দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন কিংবা প্রকাশ্যে দলীয় প্রচার প্রচারণায় রাজনীতির অংশ হয়ে ওঠেন, তখন তার পেশাগত নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
কারণ সাংবাদিকতা এবং দলীয় রাজনীতির দায়বদ্ধতা এক নয়। রাজনীতিতে দলের সিদ্ধান্ত ও আদর্শের প্রতি আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সত্য ও তথ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। এই দুই দায়বদ্ধতা যখন মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন একজন সাংবাদিকের জন্য নিরপেক্ষ থাকা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
রাজনীতির বাস্তবতাও পরিবর্তনশীল। আজ যে দল ক্ষমতায়, কাল সে দল বিরোধী দলে যেতে পারে। পাঁচ বছর বা দশ বছর পর রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। কিন্তু একজন সাংবাদিকের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার ইতিহাস থেকে যায়। ফলে ক্ষমতার পালাবদলের পর তার পুরোনো রাজনৈতিক পরিচয়ই তার সংবাদ ও বিশ্লেষণের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
এখানে বিষয়টি কাউকে রাজনীতি করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার নয়। প্রত্যেক নাগরিকের মতো একজন সাংবাদিকেরও রাজনৈতিক মতাদর্শ ও রাজনৈতিক অধিকার রয়েছে।

কলম কি দলের, নাকি সত্যের?
এখানে প্রশ্ন হলো—তিনি একই সঙ্গে সক্রিয় রাজনীতিক এবং নিরপেক্ষ সাংবাদিকের দুটি পরিচয় কতদিন সফলভাবে বহন করতে পারবেন?
একজন সাংবাদিক যদি রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চান, সেটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু তখন তার পেশাগত পরিচয়, নিরপেক্ষতা ও পাঠকের আস্থার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। কারণ সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি তার স্বাধীনতা; আর সেই স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু একজন সাংবাদিক নন, পুরো পেশাটিই।
তাই আমার ব্যক্তিগত অবস্থান স্পষ্ট—সাংবাদিকতা করতে চাইলে স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করুন, আর সক্রিয় রাজনীতি করতে চাইলে রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে রাজনীতির মাঠে থাকুন। দুই নৌকায় পা রেখে চলার চেষ্টা করলে শেষ পর্যন্ত কোন নৌকাটি ডুববে, আর কোন পরিচয়টি টিকে থাকবে—সেই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকের কলম কোনো দলের নয়, সত্যের। ক্ষমতা বদলাবে, রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাবে; কিন্তু সত্য প্রকাশের দায়িত্ব বদলানো উচিত নয়।
এটি সম্পূর্ণ লেখকের ব্যক্তিগত মতামত। কারও রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে ভিন্নমত হলে যুক্তি দিয়ে মত প্রকাশ করাই কাম্য। মতের পার্থক্য থাকুক, কিন্তু সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও পেশাগত নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা থেমে না যাক।
লেখক:
ইবনে ফরহাদ তুরাগ
সাব এডিটর, দৈনিক নিরপেক্ষ
এক্স হেড অব ডিজিটাল, দৈনিক বাংলাদেশের আলো
ইএসবি/নিউজ